দ্য এ্যালকেমিস্ট বই রিভিউ ও পিডিএফ ফ্রী!

 

 

আন্দালুসিয়ার এক তরুণ ভেড়া পালক স্যান্টিয়াগোর দিন কাটে ভেড়া চরিয়ে। উত্তেজনাবিহীন নিস্তরঙ্গ এক নিঃসঙ্গ সময় কাটে তার। এই ভেড়া পালক একদিন স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নকে বিশ্লেষণ করে এক জিপসি জানায় মিশরের মরুভূমির মাঝে গড়ে ওঠা পিরামিডের নিচে গুপ্তধন লুকানো রয়েছে। এই গুপ্তধন উদ্ধার করার জন্য বিপদসংকুল এবং দীর্ঘ এক কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দেবার সিদ্ধান্ত নেয় ভেড়া পালক তরুণ। যাত্রার শুরু থেকে আরম্ভ করে, যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের বর্ণিল চরিত্রের সাথে পরিচয় ঘটতে থাকে তার। এর মধ্যে অন্যতম একজন হচ্ছে আলকেমিস্ট। নানা ধরনের বাধা-বিপত্তি সবকিছুকে অতিক্রম করে অদম্য ভঙ্গিতে মিশরের পিরামিডের দিকে এগিয়ে চলে সে। এটাই তার স্বপ্ন। 


এই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যায় সে। প্রতি পদে পদে দেখা দিতে থাকে নানা ধরনের বাধা। বাধার সাথে সাথে অপ্রত্যাশিত সহযোগিতাও পেতে থাকে সে। কারণ, এই বইতেই বার বার বলা হয়েছে ‘হোয়েন ইউ ওয়ান্ট সামথিং, অল দ্য ইউনিভার্স কনস্পায়ারস ইন হেল্পিং ইউ টু এচিভ ইট’। তরুণ যা চেয়েছে, সেটাকে পেতে সমস্ত বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড এগিয়ে এসেছে সেই চাওয়াকে বাস্তবায়ন করতে।


সবার সহযোগিতা নিয়ে মিশরের পিরামিডের কাছে পৌঁছায় তরুণ। রত্নভাণ্ডার উদ্ধারের জন্য খননকাজ শুরু করে সে।  এই সময় হঠাৎ করেই একদল লোক ঘিরে ধরে তাকে। জিজ্ঞেস করে সে কি করছে। উত্তর জানার পরে এই দলের নেতা তাকে বলে, আমিও স্বপ্নে দেখেছি স্পেনের মাঠে যেখানে এক তরুণ ভেড়ার পালকে দেখাশোনা করে, সেখানে গাছের নিচে গুপ্তধন লুকনো রয়েছে। তরুণের বোধোদয় ঘটে, গুপ্তধন সে নিজেই, নিজের জায়গাতেই গুপ্তধন থাকে, সেটাকেই খুঁজে নিতে হয়। এর জন্য পাহাড়-পর্বত, অরণ্য কিংবা সমুদ্র পাড়ি দেবার প্রয়োজন পড়ে না।


আলকেমিস্ট একটা রূপক উপন্যাস। নিজের জীবনের লেখক হবার গল্পকেই রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন এর লেখক পাওলো কোয়েলহো। তিনি একজন ব্রাজিলিয়ান ঔপ্যনাসিক। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিলো লেখক হবেন। কিন্তু, তিনি কী হবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর বদলে অন্যেরা নিয়ে নিয়েছিলো। লেখক হবার পরিবর্তে তাঁর পরিবারের প্রত্যাশা ছিলো প্রকৌশলী হবার। পরিবারের এই প্রত্যাশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন কোয়েলহো। তাঁর বিদ্রোহকে তাঁর পরিবার মানসিক অসুস্থতা হিসাবে বিবেচনা করে এবং তাঁকে ভর্তি করায় মানসিক হাসপাতালে। এক পর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে বাইরের বিশ্বে চলে আসেন তিনি লেখক হবার স্বপ্নকে বুকে নিয়ে। বিশ্ব চরাচর ঘুরে লেখক হবার স্বপ্নকে বুকে আগলে একদিন ফিরে আসেন বাড়িতে। দ্য আলকেমিস্ট উপন্যাসে তিনি রূপকের মাধ্যমে তাঁর সেই লেখক হবার স্বপ্ন পূরণের গল্পই বলেছেন পাঠককে।


কোয়েলহো পুরো বইটা লিখেছিলেন মাত্র দুই সপ্তাহে। কীভাবে এটা সম্ভব হলো সেই উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন পুরো উপন্যাসটাই মাথার ভিতরে লেখা হয়ে গিয়েছিলো। সেখান থেকে কাগজে শুধুমাত্র কপি হয়েছে। বইটা দ্রুত গতিতে লিখলেও এর সাফল্য কিন্তু দ্রুতগতিতে আসেনি। এসেছে বেশ ধীর গতিতে। শুরুর দিকে প্রকাশক পেতেই সমস্যা হয়েছে। বইটা তেমন চলবে না এই বিবেচনায় কেউ প্রকাশ করতেই রাজি হচ্ছিলো না। অবশেষে ব্রাজিলের একটা ছোট্ট প্রকাশনী এটা প্রকাশ করার জন্য আর্থিক ঝুঁকি নেয়। পর্তুগীজ ভাষায় মাত্র নয়শো কপি বই ছাপা হয়। প্রথম মুদ্রণের পর এই বই আর ছাপায় না প্রকাশনী। কোয়েলহো গ্রন্থস্বত্ব আবার কিনে নেন এই প্রকাশনীর কাছ থেকে। দ্বিতীয় আরেকটা প্রকাশনী এই বইটা প্রকাশ করতে রাজি। দ্বিতীয়বারে সাফল্য আসে প্রথমবারের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু, মূল সাফল্য আসে বইটার ইংরেজি সংস্করণ আমেরিকা থেকে প্রকাশ হবার পরে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার লিস্টে তিনশো সপ্তাহের বেশি জায়গা দখল করে থাকে দ্য আলকেমিস্ট। কয়েক মিলিয়ন বই বিক্রি হয়ে যায়। শ খানেকেরও বেশি দেশে বইটা প্রকাশিত হয় অনুদিত হয়। এই সাফল্য যে বইটা ইংরেজিতে প্রকাশিত হবার পরে এসেছে সেটা পাওলো কোয়েলহো নিজেও স্বীকার করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “একশো উনিশটারো বেশি দেশে বইটা প্রকাশ হতে গেলে এটাকে এমন একটা ভাষায় প্রকাশ হতে হবে যেটা থাইল্যান্ড থেকে লিথুনিয়া সব দেশেই পঠিত হয়। বইটা ইংরেজিতে প্রকাশিত হওয়ায় অন্যদের পক্ষে আমার বই পড়াটা সম্ভব হয়েছিলো।” এখন পর্যন্ত আশিটির বেশি ভাষায় বইটা অনুদিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বইটা বিক্রি হয়েছে পয়ষট্টি মিলিয়ন কপি। দুই হাজার দুই সালে পর্তুগীজ লিটারারি জার্নাল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে পর্তুগীজ ভাষায় এ যাবতকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইটা হচ্ছে ‘দ্য আলকেমিস্ট’।


তাঁর বইয়ের এমন বিপুল সাফল্য বিস্মিত করেছিলো সকলকেই। নিউ ইয়র্ক টাইমসের জুলি বসম্যান তাঁকে জিজ্ঞেসও করেছিলো এই বিষয়ে। ঠিক কোন কারণে, কোন আবেদনের ভিত্তিতে দ্য আলকেমিস্ট এর এমন আকাশ ছোঁয়া সাফল্য এ ব্যাপারে কোয়েলহোকে জুলি প্রশ্ন করলে, তিনি নিজেও এর উত্তর দিতে পারেননি। শুধু বলেছিলেন, “এটা ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন। ব্যর্থতার হাজারটা কারণ বের করা যায়, কিন্তু সাফল্যের পিছনের খুব ভালো কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।” 


‘দ্য আলকেমিস্ট’ এর সাফল্যের বিষয়ে পাওলো কোয়েলহো নিজে না বলতে পারলেও আমরা জানি এর সাফল্যের রহস্য। বইটার ভিতরে এই সাফল্যের মূলমন্ত্র কোয়েলহো নিজেই বার বার লিখে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তুমি যখন অন্তর থেকে কোনো জিনিস চাও, সমগ্র বিশ্বজগতটাই ষড়যন্ত্র করবে সেটা তোমাকে পাইয়ে দিতে।” কোয়েলহো নিবিড়ভাবে লেখক হতে চেয়েছিলেন। হয়তো আরো নিবিড়ভাবে দ্যা আলকেমিস্ট এর সাফল্যও চেয়েছিলেন। তাঁর সেই চাওয়াকেই সম্মান দিতে গোটা বিশ্ব এক হয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সাফল্যের স্বর্ণ চুড়ায় নিয়ে গিয়েছে তাঁকে। তাঁর লেখা বই বিনোদন বিলোচ্ছে অকাতরে, আমোদিত করছে অগুনতি মানুষকে।

পিডিএফ পেতে ক্লিক করুন

LihatTutupKomentar