জাপান কাহিনী বই রিভিউ ও পিডিএফ ফ্রী!
জাপান কাহিনি (অষ্টম খন্ড)- আশির আহমেদ
জনরা- ভ্রমন ও ইতিহাস
পৃষ্টা-৭৭
সংক্ষেপে 'জাপান কাহিনি' সম্পর্কে বলতে গেলে 'আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ' স্যারের বয়ানে বলতে হয়- 'আশির স্যারের স্বাদু চিত্তাকর্ষক আর আমেজি লেখার মৌতাতে পাঠক হিসাবে সকলের বেশ অবাক হতে হবে। লেখাগুলো ছোট, মজাদার, বুদ্ধিদীপ্ত ও গতিশীল। বিচিত্র তথ্যে ভরপুর। জাপান কাহিনির গল্পগুলো একেবারে জাপানের ভিতরকার গল্প। লেখকের ব্যক্তিগত রসবোধ, চাউনি, বর্ণনাভঙ্গি একে প্রাণবন্ত করেছে। বইটি আমাকে জাপানের বাসিন্দা করে তুলেছে। আপনি পাঠক, আপনাকেও ঠিক তাই করে তুলবে।
জাপান কাহিনি খন্ডগুলো আমার জন্য হরেক কিসিমের টনিক হিসেবে কাজে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌতুহল উদ্দীপক তথ্যের সরবরাহ করে। বাক্য বয়ানে পূর্ণ তৃপ্তি দেয়। খানিক হাসায়। খানিক কাঁদায়। এই মুহুর্তে আবেগে উদ্বেলিত করে তো পর মুহুর্তে অভিমানের নৌকায় ভাসায়। পরিশেষে, পজিটিভির উপস্থিতি মোটিভেশনের টনিক বনে যায়...গল্প পড়তে পড়তে গল্পের রসবোধ আস্বাদনে ক্ষনে ক্ষনে মনে হয় প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ করে না, আর তাই 'হুমায়ূন আহমেদ' স্যারের শূন্যতা পূরন করতেই বুঝি 'আশির আহমেদ' স্যারের উদয়...
বিগত খন্ডগুলোর মতোই জাপান কাহিনি অষ্টম খন্ডেও ভিন্ন রকমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গল্পের পসরা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। যেমন রয়েছে -
♣জাপানী ভাবী- একজন ভিনদেশি তরুনীর বাংলার বঁধু হয়ে উঠার প্রেমময়-মধুর গল্প। ভিন্ন ভিন্ন দুই কালচারের যুবক-যুবতি হওয়া সত্ত্বেও একই অনুভূতির সাথে মিশে যাওয়ার গল্প...
♣জাপানী পুত্রদায়গ্রস্ত মাতা- হ্যাঁ। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা নয়। ছেলের বয়স ৪৪। অবিবাহিত। ক্যান্সারে আক্রান্ত সাথে পুত্রদায়গ্রস্থ পিতা একদিন পরপারে পাড়ি জমান। ছেলের দায়িত্ব মাতার কাধে চেপে হয়ে যান পুত্রদায়গ্রস্থ মাতা। জাপান খুব ক্যালকুলেটিভ জাতি। এরা গড় আয়ু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থেকে অধিকাংশই কলেজ জীবনেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত হওয়ার সাথে সাথে পছন্দের জীবন সঙ্গিনীও বেছে নেয়। যে মুষ্টিমেয় সংখ্যক পাত্র-পাত্রী বাকি থাকে তাঁদের জন্যই পুত্রদায়গ্রস্থ পিতা বা মাতার উপর তাঁদের দায়িত্ব বর্তায়। এমন অধ্যায়ে ফানশনগুলো কেমন কঠিন তার বৃত্তান্তই আলোচনা করা হয়েছে।
♣ নেতাকে নেতা মানতে শেখা-
'নেতা মানে নেতা নয়
নেতা মানে দায়িত্ব।'
জাপানে এই দায়িত্ববোধের বীজ বপন হয় সেই কিন্ডারগার্টেন থেকে। প্রত্যেক ছাত্রকে কোন কোন ইভেন্টে লিডার হতে হয়।
জাপানি নেতাকে কতোটা মূল্যায়ন করা হয় তা বুঝাতে লেখক দুটি ঘটনার বর্ননা করেছেন-
১। ফুকুওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচজন ছাত্র মিলে পর্বত আরোহন করতে গেল হোক্কাইদা অঞ্চলের এক পাহাড়ে। উচ্চতা ১৯৭৯ মিটার। রাতের বেলা তাবু টাঙিয়ে শুতে যাবে এমন সময় এক ভাল্লুক এসে তার উপস্থিত জানান দিয়ে গেলো। ভাল্লুক থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায় তার সূত্র জানা ছিল। চেষ্টাও করেছে।
পাঁচজনের মধ্য একজনকে নেতা বানানো হল। নেতা সবার মতামত নিলেন। পরিকল্পনা করলেন।
ভাল্লুক এলেন একজন ভাল্লুকের পেটে গেলেন। পরদিন ভাল্লুকের ভয়ে এদিকওদিক পালাতে গিয়ে আরও একজন ভাল্লুকের খাবারে পরিনত হলেন।
লিডার সাহেব বাকি দুইজনকে পালানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়ে নিজের শরীর ভাল্লুককে উপহার দিলেন। ভাল্লুক লিডার সাহেবকে খেতে খেতে বাকি দুজন প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন। সেই দুজন এখনও বেঁচে আছে। লিডারের কথা অশ্রুসহ স্মরন করেন। এই হলো জাপানের নেতার নতাগিরির নমুনা।(কাহিনি সংক্ষেপ)
২।জাপানের ফুকুশিমা প্রিফেকচার বিশ্বে পরিচিত হয়েছে ২০১১ সালের ৎসুনামির সময়। এই প্রিফেকচারে আইযু নামের একটা শহর আছে। শহরটির ঐতিহাসিক পরিচিতি আছে বিয়াক্কোতাই 'সাদা বাঘের দল' নামের একটা টিনেজার সামুরাই গ্রুপের কান্ড দিয়ে।
১৮৬৮-১৮৬৯ সালের বো-শিন যুদ্ধ চলছে। ৩০৫ জনের বিশাল বাহিনি। তার মধ্যে ২০ জনের স্কোয়াড ছিল। ১৬-১৭ বয়স। তাদের দায়িত্ব ছিল ইমোরি নামক এক পাহাড় থেকে শত্রুদের ট্রেস করা। শহর পাহাড়া দেওয়া। হঠাৎ চোখে পড়লো তাদের দুর্গখানা দাউ দাউ করে জ্বলছে।
দুর্গ দাউ দাউ করে জ্বলা মানে শত্রুপক্ষ দুর্গ দখল নেওয়া। তার মানে যুদ্ধে পরাজিত হওয়া। যুদ্ধে পরাজিত মানে শত্রুদের নিকট আত্মসমর্পণ না করে 'হারাকিরি' নিজের পেট নিজে কেটে আত্মহত্যা করা। হারা মানে পেট কিরি হচ্ছে কাটা।
২০ জম টিনএজার সবাই সফল হলো না। একজন দুর্ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেল।
তাদের হাইপোথেসিস ভুল ছিল। তাদের নেতা হারেনি। দুর্গ জ্বলেনি। শহরের অন্য প্রান্ত থেকে ধোঁয়া উড়ছিল। তারা ভুল মেসেজটি পেয়েছে। ১৯ টি অপ্রয়োজনীয় অকালমৃত্যু। লিডারের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে আজও ইতিহাস হয়ে আছে ১৯ বালকের কান্ড কাহিনি।
(এই হচ্ছে জাপানি নেতার দায়িত্ব আর নেতার প্রতি দলের আনুগত্যের দুই কাহিনি।
এবার অনুধাবন করেন জাতি হিসেবে এগিয়ে যাবে কারা। পিছিয়ে থাকবে কারা।)
♣ সত্য বের করার অভিনব পদ্ধতি- প্রচলিত পদ্ধতির(মাইর বলেন, হুমকি বলন, শক বলেন) বাইরে গিয়ে মনোবিশ্লেষনের সাহায্যে কি করে অপরাধীর মুখ থেকে অপরাধ শিকার করানো যায় তার অভিনব সিস্টেমের আলোকপাত করা হয়েছে এখানে। আপনি পড়বেন, জানবেন। অবাক হবেন আর অবাক হতেই থাকবেন।
(অবশ্য আমাদের আদালত ফটোফ্রুটেজ বলেন আর ভিডিও ফ্রুটেজ বলেন দেখেও
শত্রুদের চিহ্নিত করতে পারেন না। আর আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও পুলিশ-আসামি এক সাথে কেক কাটলেও আসামিদের গ্রফতার প্রসঙ্গে তাদের নাগাল পায় না...)
এছাড়াও জাপানি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্ব, জাপানি প্রফেসরের দায়িত্ব, তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার সমাধান, লেখকের আম্মা তাদের স্বপ্নগর্ভার ভালোবাসার বৃত্তান্ত, আমাদের আরজে কিবরিয়া ভাইয়ের অতি পরিচিত অনুষ্ঠান 'আপন ঠিকানা' নিয়ে লেখকের আপডেট ভাবনা, জাপানের বাড়িঘরের ডিজাইন, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা, আনস্মার্ট সিইও, অভিনব পদ্ধতিতে ই-প্রতারণার কৌশল লেখকের দুর্দান্ত হিউমারের সাহায্য প্রতিটি কাহিনিই হয়ে উঠে প্রাণবন্ত।
বিঃদ্রঃ করোনাকাল উপস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে লেখকের পিতামাতার পরলোকগমন লেখার উপর কিছুটা ছাপ পড়েছে মেবি। সব কিছুই লেখায় আগের মতো ঠাঁই করে নিয়েছে, তবুও মনে হচ্ছে কি কিছু যেন ঘাটতি এসে গেছে লেখায়!
এর কলেবর আরও একটু বড় পরিসরে চাই।।
প্রত্যাশা থাকবে আরও সময় নিয়ে, আরও অবাক করা, অবাক করা কান্ড নিয়ে জাপান কাহিনির প্রবাহ অব্যাহত থাকবে, আমাদের মতো কৌতুহলী কিছু পাঠকের কৌতুহল দমাতে...

